Wednesday, 11 June 2025

2026 এ কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভায় খেলা জমে যাবে যদি বিজেপি এই কাজ করতে পারে?

 শুভ কল্যাণ বিশ্বাস, দৃষ্টি বাংলা, কৃষ্ণনগর  - ২০১১ সাল থেকে কৃষ্ণনগর দক্ষিণ তৃণমূলের দখলে। উজ্জ্বল বিশ্বাস পরপর তিনবার তৃণমূলের বিধায়ক হয়েছেন কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা থেকে। ২০২১ সালের ৫% ভোটের পার্থক্য নিয়ে বিজেপিকে হারিয়ে  তিনি তৃতীয় বারের জন্য বিধায়ক হয়েছিলেন। 
 কিন্তু ২০২৬ সাল একটা সহজ অংক বিজেপি খেলে দিতে পারলেই এখানে খুব সহজেই বাজিমাত করতে পারবে। খেলাটা হয়তো সহজ কিন্তু তাকে গ্রাউন্ডে নামিয়ে দেওয়াটা অনেক কঠিন। প্রত্যেকটা বুথ ধরে ধরে যদি কর্মীদের এখনই গ্রাউন্ডে নামিয়ে দেওয়া যায় তাহলেই বাজিমাত করতে পারবি বিজেপি এই বিধানসভায়।
 ভোটের পরিসংখ্যান দিয়ে বিবেচনা করা যাক। ২০১১ সালে উজ্জ্বল বিশ্বাস ৭১ হাজার ৩৯২ ভোট পেয়েছিলেন। যেটা কিনা মোট ভোটের ৪৬ শতাংশ। আর সিপিএমের রমা বিশ্বাস পেয়েছিলেন ৬০ হাজার ৩৬৪ ভোট যেটা কিনা মোট ভোটের ৩৯ শতাংশ। আর বিজেপির মহাদেব সরকার পেয়েছিলেন ১৪হাজার ৩৯৮ ভোট যেটা মোট ভোটের ৯ শতাংশ। 
 ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে  উজ্জ্বল বিশ্বাস দ্বিতীয়বারের জন্য বিধায়ক হন ৮০ হাজার ৭১১ ভোট পেয়ে যেটা কিনা মোট পোলিং ভোটের ৪৬ শতাংশ।  আর সিপিএমের মেঘলাল শেখ  ৬৭ হাজার ৮৯৭ ভোট পেয়েছিলেন। যেটা কিনা মোট পোলিং ভোটের ৩৮ শতাংশ। বিজেপির মহাদেব সরকার পেয়েছিলেন ২২হাজার ৮৫০ ভোট যেটা কিনা মোট ভোটের ১৩ শতাংশ। 
 ২০২১ সালে উজ্জ্বল বিশ্বাস তৃতীয়বারের জন্য বিধায়ক নির্বাচিত হন ৯১ হাজার ৭৩৮ ভোট পেয়ে। যেটা কিনা মোট ভোটের ৪৭ শতাংশ। আশ্চর্যের বিষয় ২০২১ সালে বিজেপি এখানে তৃতীয় স্থান থেকে দ্বিতীয় স্থান দখল করে। বিজেপির মহাদেশ সরকার ৮২ হাজার ৪৩৩ ভোট পেয়েছিলেন। যেটা কিনা মোট পোলিং ভোটের ৪২ শতাংশ। আর সিপিএমের সুমিত বিশ্বাস পেয়েছিলেন ১৫ হাজার ৬০০ ভোট। যেটা কিনা মোট ভোটের আট শতাংশ। 
 ২০১১ সালে বিজেপি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ২০২১ সালে সিপিএম সেই স্থানে চলে আসে। আর বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের ভোটের পার্থক্য দাঁড়ায় পাঁচ শতাংশ মাত্র। ২০২১ সালে বিজেপির প্রার্থী নির্বাচনে কর্মীদের মধ্যে যে মত বিরোধ ছিল সেটা কিন্তু প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল সেই সময়। এখানে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির পার্থক্য ছিল মাত্র ৯৩০০ ভোটের। 
 এবার তুলে ধরা যাক এই বিধানসভার জাতপাতের ভিত্তিতে ভোটের পরিসংখ্যান।
 ২০১১ সালের কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভায় মুসলিম ভোট ছিল ১৭ শতাংশ। যেটা ২০২১ সালে এসে দাঁড়ায় ২৭.৫%। 
 অর্থাৎ বিগত ১০ বছরের ১০ শতাংশ মুসলিম ভোট বেড়েছে এই বিধানসভায়। 
 এখন আসা যাক কিভাবে বিজেপি এই বিধান সভা জয়লাভ করতে পারবে সেই সহজ অংকটা তুলে ধরা। 
 ২০২১ সালের সিপিএম যে ১৫ হাজার ভোট পেয়েছিল তার ৯৮ শতাংশ  হিন্দু ভোটার। যে সমস্ত পরিবার ২০২১ সালে সিপিএম করেছিল তাদেরকে বোঝাতে হবে সিপিএমও তোষণের রাজনীতি করেছে পশ্চিমবঙ্গে। বর্তমানে তারা ক্ষমতায় না থাকলেও তোষণের রাজনীতি থেকে তারা এক ইঞ্চি সরে আসেনি। এই কথাটাই হিন্দুদের কে বোঝাতে হবে যারা সিপিএম করে। তাহলে কিছু হিন্দু ভোটার এখান থেকে রিকভারি করা যাবে।
 এখন আসা যাক অংকের হিসাবে, কৃষ্ণনগরে দক্ষিনে দু'লক্ষ ২৫ হাজার ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা বেশি। মহিলা ভোটারের সংখ্যা কিছুটা কম। সবচেয়ে বেশি ভোটার যুবক যুবতী।
 যদিও এখানে যুবক যুবতীদের ভোট প্রায় 90% বিজেপির দখলে গেছে গতবার বিধানসভায়। 
 মুসলিম ভোটারের ২৭.৫% এর মধ্যে প্রায় ৯০% তৃণমূল পেয়ে থাকে। ১০ থেকে ১১ শতাংশ হিন্দু  মহিলা ভোটার তৃণমূলের দখলে এই বিধানসভায়। 
 এবার আসা যাক কোন কোন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তৃণমূলকে ভোট দিয়ে থাকে। সিভিক ভলেন্টিয়ার এর পরিবার, টোটো অটো রিক্সার পরিবার, অফিস আদালতে কন্ট্রাকচুয়াল কর্মচারী যারা কর্মচারী তাদের পরিবারের ভোট, যে সমস্ত হিন্দু তৃণমূল নেতা আছে তাদের পরিবারের ভোট। 
 তবে সব টোটো অটো ইউনিয়নের লোক যে তৃণমূল কে ভোট দেয় সেটা বলা যাবে না, অনেক টোটো অটো ওয়ালারা ভোট দিতে চায় না তৃণমূলকে। 
 এই সমস্ত পরিবারের লোকজনের সঙ্গে জনসংযোগ বৃদ্ধি করতে হবে বিজেপির। 
 এবার আসা যাক ভোটার ক্যাটাগরিতে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ভোটার সাধারণত চার ধরনের হয়ে থাকে। A B C D এই চার ধরনের ভোটার নির্ণয় করে তাদের সঙ্গে সেই মতো জনসংযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। 
A ক্যাটাগরির ভোটার অর্থাৎ অ্যাটাকটিভ ভোটার। এই ভোটার হল প্রধান বিরোধীদলের ভোটার। অর্থাৎ বর্তমানে বিজেপির ভোটার। যার পরিমাণ ৩০ শতাংশ। 
B ক্যাটাগরির ভোটার অর্থাৎ ব্যালেন্স ভোটার। যার পরিমাণ ২০ শতাংশ। এটা কোন দলের ভোটার নয়। এরাই ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রধান নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। 
C ক্যাটাগরির ভোটার অর্থাৎ কারেন্ট পার্টির। যেটা কিনা শাসকদলের ভোটার। এই ভোটারের পরিমাণ ৪০ শতাংশ।
D ক্যাটাগরির ভোটার অর্থাৎ ডিফিকাল্ট বা ডিফারেন্ট ভোটার। যার পরিমাণ ১০ শতাংশ।
 এই ভোটার পঞ্চায়েত বা পৌরসভা নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। 
 এখন বিজেপিকে বি এবং ডি ক্যাটাগরির ভোটারেরকে টার্গেট করতে হবে। 
 ডি ক্যাটাগরির ভোটার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বুথ সভাপতির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 
 প্রত্যেকটা ভোটার লিস্টে খোঁজ নিলে দেখা যায় অনেক ভোটার লিস্ট এ মৃত মানুষের ভোট থেকে যায় সেই ভোট কিন্তু পোলিং হয়ে যায় অনেক সময়। কিছু ভোটার আছে তারা দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতেই থাকে না, বা ভোট দিতে আসে না এই সমস্ত ভোটারদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করতে হবে। 
 তবেই বিজেপি এখান থেকে কিছুটা অ্যাডভান্টেজ পেতে পারে। অর্থাৎ বি এবং ডি ক্যাটাগরির ভোটারকে টার্গেট করে এগোতে হবে সর্বদা সক্রিয় কর্মীদেরকে। এই দুই ক্যাটাগরির ভোটারের সঙ্গে জনসংযোগ বৃদ্ধি করার জন্য পুরনো বিজেপি কর্মীদেরকে এগিয়ে দিতে হবে। 
 এখন দেখা যাক প্রার্থী নির্বাচনে জয়ের ভূমিকা কতটা নির্ভর করে। 
 কর্মীদের পছন্দের প্রার্থী না হলে যেকোনো দলই লড়াইয়ে নামার আগেই পিছিয়ে থাকে। বিজেপিকে সর্বপ্রথম যে কাজটা করতে হবে সেটা হলো ভূমি পুত্রকে বেছে নিতে হবে অবশ্যই কর্মীদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে। তবেই জয়ের রাস্তা কিছুটা এগিয়ে যাবে। 
 এখন দেখে নেওয়া যাক কারা কারা প্রার্থীর দৌড়ে আছে শাসক এবং বিরোধী দলের মধ্যে থেকে। 
 এই মুহূর্তে তৃণমূলের প্রার্থীর দৌড়ে আছেন অবশ্যই উজ্জ্বল বিশ্বাস। গোপন সূত্রে খবর পাওয়া যাচ্ছে তৃণমূল জেলার নেতৃত্বের সঙ্গে এই মুহূর্তে সুসম্পর্ক বজায় নেই উজ্জ্বল বিশ্বাসের। সে ক্ষেত্রে অভিষেক ঘনিষ্ঠ একজনের নাম শোনা যাচ্ছে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে তিনিও এগিয়ে আছেন। 
 বিরোধী অর্থাৎ বিজেপির পক্ষ থেকে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে অবশ্যই নাম থাকছে মহাদেব সরকারের। কিন্তু 21 সালেই এই মহাদেব সরকারের মনোনয়ন নিয়ে দলের মধ্যেই কোন্দল  সৃষ্টি হয়েছিল। জেলা সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ তিনিও প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। এছাড়া জেলা সভাপতি অর্জুন বিশ্বাস, জেলা যুব মোর্চার সভাপতি বিশ্বজিৎ সরকার, প্রাক্তন  আরএসএস প্রচারক অলোক কুন্ডু,জেলা সহ-সভাপতি প্রানবন্ধু বিশ্বাস  এর নাম জনমত সমীক্ষায়  উঠে এসেছে কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভার প্রার্থী হওয়ার জন্য। 

 জনমত সমীক্ষায় এই মুহূর্তে কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভায় বিজেপি জয়ের সম্ভাবনা ৪৮% ও তৃণমূলের জয় সম্ভাবনা ৫২%। তবে যদি বিজেপি সঠিক প্রার্থী নির্বাচন  করতে পারে এবং বিজেপি পুরনো কর্মীদেরকে মাঠে নামাতে পারে তাহলে এই জয় আটকাতে পারবেনা তৃণমূল। এখানে তাহলে বিজেপি এগিয়ে যাবে। মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা এবং অপারেশন সিঁদুর বিজেপিকে অনেকটাই অ্যাডভান্টেজ দিয়েছে। পাশাপাশি এসএসসির দুর্নীতি কান্ড রয়েছে যেটা ২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের ইস্যু হতে চলেছে। 
 এখন দেখা যাক কে বা কারা এখানে প্রার্থী হন এবং কোন দল জয় লাভ করে সেটা সময়ের উপর নির্ভর করবে।

 
 

শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: